নিউজডেস্ক : ‘ধর্মীয় উস্কানীমূলক’ লেখালেখির অভিযোগে তিন ব্লগারকে গ্রেপ্তারের পর আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ তাদের ব্লগ বন্ধ করে দিয়েছে। ব্লগারদের নিয়ে নোংরা রাজনীতির খেলা শুরু হয়েছে। অন্যায়ভাবে ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্লগারদের নিঃশর্ত মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ব্লগটি বন্ধ থাকবে বলে আমারব্লগের হোম পেইজে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, “দরকার নাই ব্লগিংয়ের আর, দরকার নাই আমারব্লগ এর...বিদায়।” সোমবার রাতে রাজধানীর ইন্দিরা রোড, পলাশি ও মনিপুরি পাড়া এলাকা থেকে ব্লগার সুব্রত অধিকারী শুভ, মশিউর রহমান বিপ্লব ও রাসেল পারভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ল্যাপটপ ও কম্পিউটারও জব্দ করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার তিন ব্লগারকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার আমারব্লগের হোম পেইজে কালোর মধ্যে সাদা রঙের লেখায় লেখা হয়, “ব্লগারদের নিয়ে নোংরা রাজনীতির খেলা শুরু হয়েছে। অন্যায়ভাবে ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে কোনো কারণ উল্লেখ না করে বন্ধ দেয়া হয়েছে আমারব্লগ ডটকম। সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা মৌলবাদী জঙ্গিদের এই হীন তৎপরতায় আমরা বাকরুদ্ধ। নিন্দা জানানো ভাষা আমাদের জানা নেই।” ব্লগারদের নিঃশর্ত মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত আমারব্লগ বন্ধ থাকবে বলে এতে ঘোষণা দেয়া হয়। এর আগে গত ২২ মার্চ কয়েকজন ব্লগারের তথ্য চেয়ে আমারব্লগ ডটকমকে চিঠি দেয় বিটিআরসি। ওই চিঠিতে রাষ্ট্র ও ধর্মবিরোধী লেখালেখির অভিযোগ তুলে ওই ব্লগারদের লগইন বৃত্তান্ত, আইপি ও ই-মেইল ঠিকানা চাওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের সব লেখা ২১ মার্চের মধ্যে মুছে ফেলারও অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে এর পরেই এক বিজ্ঞপ্তিতে আমার ব্লগ ডটকম জানায়, অ্যাকাউন্ট বাতিল এবং ব্লগারদের ব্যক্তিগত তথ্য তারা দেবে না। আমারব্লগের তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশের দুই দিনের মাথায় গত ২৪ মার্চ বিটিআরসি জানায়, আইন অনুযায়ী তথ্য না পেলে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার তাদের রয়েছে। চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে ১২টি ব্লগ ও ফেইসবুক পেইজ বন্ধ করে দেয় বিটিআরসির সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে গঠিত বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিডি-সিএসআইআরটি) বন্ধ করে দেয়া ব্লগের মধ্যে রয়েছে সোনার বাংলা ব্লগ, শাহবাগের আন্দোলনকারীরা যাকে জামায়াত-শিবির পরিচালিত বলে অভিযোগ তুলেছিলেন। গত ১৩ মার্চ ফেইসবুক ও ব্লগে ইসলাম ও হযরত মুহম্মদ (সা.) কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যকারীদের সনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নয় সদস্যের কমিটি করে সরকার। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), আইন ও বিচার বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক এবং পুলিশের (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) অতিরিক্ত ডিআইজিকে রাখা হয়েছে। ফেইসবুক ও ব্লগে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে রোববার একটি ই-মেইল ঠিকানা খুলে এই কমিটি। বিটিআরসির তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে এবং ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩২ লাখের বেশি।তিন ব্লগারের মুক্তির দাবিতে ঢাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমাবেশ
এদিকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে গ্রেফতার তিন ব্লগারের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদী সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুধবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্রতিবাদী সমাবেশ ও সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মার্স্টাসের শিক্ষার্থী সুব্রত অধিকারী শুভ, সাবেক শিক্ষার্থী মশিউর রহমান বিপ্লব ও রাসেল পারভেজকে সোমবার দিনগত রাতে রাজধানীর পলাশী, ইন্দিরা রোড ও মনিপুরী পাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই সরকার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান তিন শিক্ষার্থীকে আটক করেছে। আটকদের মধ্যে সুব্রত শুভকে জগন্নাথ হলের রুম থেকে ডেকে নিয়ে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের এই তিন সাহসী তরুণের মুক্তির দাবিতে তারা কখনই পিছপা হবেন না।
ব্লগারের মুক্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন ব্লাগারদের:
অপরদিকে, আটক তিন ব্লগার শাহবাগ গণজাগরণের গণআন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেছেন ব্লগাররা। তাদের দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধসহ ৬ দফা দাবিতে চলমান গণআন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন এই তিন ব্লগার। ব্লগারদের অভিযোগ, গণজাগরণ আন্দোলনের বিরোধিতাকারী হেফাজতে ইসলামকে তুষ্ট করতেই তিন ব্লগারকে আটক করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্লগারদের পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হক, আরিফ জেবতিক, সাবেক ছাত্রনেতা বাকি বিল্লাহ, ব্লগার আবু মোস্তাফিজ ও পারভেজ আলম। সংবাদ সম্মেলন থেকে আটক ৩ ব্লগারকে মুক্তির পাশাপাশি ‘আমার ব্লগ’-এর ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। ব্লগারদের আটকে সিপিবি’র নিন্দা: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ তিন ব্লগারের আটকের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সিপিবি নেতারা আটক ব্লগারদের মুক্তির দাবি জানিয়ে বলেন, ‘কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া হলে তা যেমন প্রশ্রয় দেওয়া যায় না; তেমনি এ ধরনের কাজ বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি। কিন্তু, একই সঙ্গে দেশের জন্য বড় বিপদ হলো- সাম্প্রদায়িকতা।’ নেতারা বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য ব্লগারদের আটক করা হয়েছে। এটা সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি সরকারের উপহার। অন্যদিকে, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠন, তাদের দমনের জন্য আইন সংশোধনসহ যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা মুক্তচিন্তা চর্চার বিরুদ্ধে সরকারের একটি পশ্চাদমুখি পদক্ষেপ।’ সিপিবি নেতারা আরও বলেন, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে যারা পত্রিকায় মিথ্যা-বানোয়াট ছবি ও খবর প্রকাশ করে দেশব্যাপী প্রচার করেছে, তাদের আটক করে শাস্তি বিধান করাটা সরকারের জরুরি কর্তব্য।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শুধু তাই নয়, যারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, বসতবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়েছে, ভাঙচুর করেছে, লুটপাট করেছে তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করা সরকারের সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য।’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা রক্ষা করার জন্য জরুরি কর্তব্যের প্রতি নজর না দিয়ে সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সন্তুষ্ট রাখার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা শুধু সরকার ও সরকারি দলের জন্যই আত্মঘাতী হবে না, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার পরিপন্থি’ বলেও মনে করেন সিপিবি নেতারা।
