সোমবার, ১ এপ্রিল, ২০১৩

হরতালের আগেই সহিংসতা

নিউজডেস্ক : আবারো হরতালের আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমাবাজি, ভাংচুর ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বোমা বিস্ফোরণের পর কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এরপর রাত পর্যন্ত আগুন দেয়া হয় অন্তত সাতটি গাড়িতে। বাস পোড়ানো হয়েছে গাজীপুরেও। খুলনায় পুলিশের পিকআপভ্যানসহ অন্তত পাঁচটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। গাড়ি পোড়ানোর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। বগুড়ায় হাতবোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন এক প্রকৌশলী। চট্টগ্রাম ও ফেনীতে রাতে কয়েকটি স্থানে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। রাজশাহীতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে আবারো। বগুড়ায় আগুন দেয়া হয়েছে রেল স্টেশনের একটি কক্ষে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের দিনব্যাপী হরতালের আগের দিন এসব ঘটনা ঘটে।
আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তি দাবি এবং পুলিশের ‘হত্যাকাণ্ডের’ প্রতিবাদে দেশব্যাপী এই হরতাল দেয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়দুর্গত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে হরতালের আওতামুক্ত রেখেছে ১৮ দল। ১৮ দলের পাশাপাশি মঙ্গলবার হরতাল ডেকেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরও। সংগঠনের সভাপতিকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এই কর্মসূচি তাদের। হরতালের আগে নাশকতার জন্য সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের দায়ী করা হলেও বিএনপির দাবি, সরকারের ‘লোকজনই’ তা করেছে।

দায়ী সরকারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা: ফখরুল

নয়া পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিবাদ সমাবেশের পর গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও হাতবোমা ঘটনার জন্য সরকারের ‘মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতার গুলশানের কার্যালয়কে লক্ষ্য করে গতরাতে (রোববার) আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করেছে। “ওই ঘটনার প্রতিবাদে আজকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে শেষ হওয়ার পর গণমাধ্যমসহ কয়েকটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সরকারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরাই জড়িত।” বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিলে পুলিশি আক্রমণের বিগত কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে ফখরুল বলেন, “দেখা গেছে, পুলিশি বাহিনী আমাদের মিছিল ও মিটিংয়ে সরাসরি গুলি করেছে। ঘটনা ঘটিয়ে তারা (সরকার) দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দিয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতার কার্যালয়ে সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা গুলি করে। এ ঘটনা থেকে প্রমাণ হয়, দেশে কোনো আইনের শাসন নেই। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নেই।” কূটনৈতিক পাড়া হিসেবে চিহ্নিত গুলশানে গুলিবর্ষণের এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার নজির, বলেন তিনি। খালেদা জিয়ার কার্যালয় লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সারাদেশে জেলা-উপজেলায় সমাবেশ হবে বলে জানান ফখরুল। মঙ্গলবারের হরতাল সফল করার জন্যও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। মির্জা ফখরুল জানান, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ত্রাণকাজের জন্য হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।

বাসে আগুন

রাজধানীতে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুটি বাস, সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের একটি গাড়ি এবং চারটি প্রাইভেটকারে আগুন দেয়া হয়। দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির প্রতিবাদ সমাবেশের শেষ পর্যায়ে তিনটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এর মধ্যে সংবাদ সংগ্রহের কাজে থাকা এটিএন নিউজের একটি গাড়িও রয়েছে। গাড়ির চালক মো. সোলায়মানকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পল্টন থানার ডিউটি অফিসার খোরশেদ আলম বলেন, “প্রতিবাদ সমাবেশে আসা কর্মীরা গাড়িতে আগুন দিয়ে ককটেল ফাটিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।” রমনা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুশিউর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বিজিএমইএ ভবনের সামনে থাকা রাষ্ট্রায়াত্ত গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবহনে নিয়োজিত একটি বাসে আগুন দেয় হরতাল-সমর্থকরা। এর আগে দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সামনে শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি দোতলা বাসে আগুন দেয়া হয়। পুলিশের সহকারী কমিশনার ইমানুল হোসেন জানান,  বেলা সাড়ে ১২টার দিকে দুর্বৃত্তরা ‘তরঙ্গ’ নামের বাসটিতে আগুন দেয়ার পর ফায়ার ব্রিগেডের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ায় কাজে ব্যবহৃত বিআরটিসির বেশ কয়েকটি বাস বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের পূর্ব পাশে দাঁড় করানো ছিল। দুর্বৃত্তরা শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে এসে একটি বাসে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়।” সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কারওরান বাজারের ওয়াসা ভবনের সামনে একটি প্রাইভেটকারে এবং মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়িতে অন্য একটি প্রাইভেটকারে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দেয়। গাজীপুরের শিববাড়ি মোড়ে রাত ৯টার দিকে ভিআইপি পরিবহনের (২৭ নম্বর) একটি বাসে আগুন দেয়া হয় বলে জয়দেবপুর থানার ওসি এস এম কামরুজ্জামান জানিয়েছেন। খুলনা নগরীতে সন্ধ্যায় পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যানসহ পাঁচটি গাড়িতে আগুন দেয় জামায়াত-শিবির সমর্থকরা।এছাড়া শিববাড়ী মোড় থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত এলাকায় ৫/৬টি ইজিবাইক ভাংচুর করেছে তারা। দিনাজপুরে সন্ধ্যায় হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বাস ভাংচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা।

বগুড়ায় স্টেশনে আগুন

রাতে বগুড়া রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের কক্ষে আগুন দেয়া হয়। এজন্য জামায়াত-শিবিরকর্মীদের দায়ী করেছেন স্টেশন কর্মকর্তারা। বগুড়া রেল স্টেশনের সুপারিনটেনডেন্ট বেলাল হোসেনসংবাদ মাধ্যমকে বলেন, রাত পৌনে ১১টার দিকে স্টেশন মাস্টারের কক্ষে গান পাউডার দিয়ে আগুন দেয়া হয়।

হাতবোমা বিস্ফোরণ

বগুড়া শহরে রাত ৮টার দিকে পাঁচটি স্থানে অন্তত ১০টি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণে বগুড়ার গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী খাদেমুল ইসলাম গুরুতর আহত হয়েছেন। চোখে জখম নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি। তেলিপুকুর, ইয়াকুবিয়ার মোড়, খান্দার, পিটিআই মোড় এবং বগুড়া প্রজন্ম থেকে ৬০ গজ দূরে পোস্ট অফিসের সামনে হাতবোমার বিস্ফোরণগুলো ঘটে। একই ধরনের বিস্ফোরণ হয় চট্টগ্রাম নগরীতেও। বোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় চকবাজার এলাকা থেকে এক শিবিরকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত নগরীর চেরাগীর পাহাড় মোড়, চকবাজার অলি খাঁ মসজিদ মোড়, এনায়েত বাজার, কাজীর দেউরী মোড়সহ বেশ কয়েকটি স্থানে শিবিরকর্মীরা হাতবোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুপুর আড়াইটায় সলিমুল্লাহ হলের সামনে দুটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিকাল ৪টার দিকে কলাভবন এলাকায় এবং টিএসসিতে একটি করে বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া কলাভবনের সামনে থেকে তিনটি, টিএসসির ডাসের সামনে থেকে তিনটি, কার্জন হলের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সামনে থেকে চারটি এবং মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সামনে থেকে চারটি হাতবোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ আলী জানিয়েছেন। রাত পৌনে ১২টার দিকে ফেনী শহরে কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে।